সার
টবে সারা বৎসর গাছ বাঁচিয়ে রখতে এবং সঠিক ভাবে প্রচুর ফুল পাতে গাছের সার ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সার দেয়ার আগের দিন গাছে পানি দিয়ে নিতে হবে। সার দেয়ার আগে গাছের গোড়ার মাটি ভালোভাবে খুঁচিয়ে দিতে হবে। সাবধান বাল্ব/কন্দ যেন ক্ষতি / আঘাত প্রাপ্ত না হয়। এরপর উপরের মাটি সরিয়ে টবের চার দিক ঘেষে সার দিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে সার যেন গাছের গোড়ায় না লাগে বা গোড়া থেকে একটু সরে থাকে।
গাছে ফুল আসার ১ মাস আগে (জুন) থেকে ফুল থাকা প্রর্যন্ত ১ মাস (আগষ্ট) টব আনুযায়ী সার দিতে হবে। টবে সারের ব্যবস্থাপণা নিম্নরূপঃ
|
টবের আকার |
সারের নাম |
পরিমান |
নিয়ম |
|
১০-১২ ইঞি |
ইউরিয়া |
হাফ চা চামুচ |
একত্রে ভালোভাবে মিশিয়ে প্রত্যেক ১৫ দিন পরপর দিতে হবে। |
|
টিএসপি (পটাস) + এমওপি (ফসফেট) |
১চা চামুচ |
||
|
৮ ইঞি |
ইউরিয়া + টিএসপি (পটাস) + এমওপি (ফসফেট) |
হাফ চা চামুচ |
একত্রে ভালোভাবে মিশিয়ে প্রত্যেক ১৫ দিন পরপর দিতে হবে। |
এছাড়া ভালো মানের ফুলের জন্য বরিক এসিড/পাউডার ও জিন্ক সালফেট ১চা চামুচ করে সার এর সাথে প্রয়োগ করা
যেতে পারে।
অন্য সময় মাসে ১
বার হারে দেয়া যেতে পারে।
পরিচর্যা
রজনীগন্ধা গাছ পানি খুব ভালোবাসে। তাই প্রতিদিন নিয়ম করে পানি দিতে হবে। তবে মাটি স্যাঁতসেঁতে থাকলে সেই কয়দিন পানি দেওয়ার
প্রয়োজন নেই। কারন এ গাছ পানি খুব পছন্দ করলেও গোড়ায় পানি জমে থাকা একদম পছন্দ করে না। তাই শীতকালে মটিতে পানির অবস্থা বুঝে বুঝে ১-২ দিন পর পর পানি দিতে হবে। তাছাড়া ফুল আসার সময়ও মাটি ভেজা থাকলে ফুল আসতে দেরী হয়।
তিন বছর পরপর শীতকালে রজনীগন্ধার ঝাড় তুলে আবার
নতুন করে লাগানো ভালো। এক্ষেত্রে পুষ্পমঞ্জুরীর দন্ডের শেষ জোড়া কুঁড়ি ফুটে গেলে দন্ডের গোড়া থেকে ৪ ইঞি উপরে কেটে কন্দ সংগ্রহ করতে হবে।
গাছের গোড়া থেকে শুকনো বা মরা পাতা সরিয়ে ফেলতে হবে। শীতকালে গাছের উপরের অংশের পাতা কেটে
কমিয়ে দিতে হবে। পাতা কাটলে গাছের ক্ষতি হয় না বরং পরবর্তীতে গাছকে আরও সবল করতে সাহায্য করে। তবে গাছ কাঁটাই-ছাটাই এর পর ফ্যঙ্গিসাইট স্প্রে করে সমস্ত গাছ ধুয়ে দিতে হবে।
দিনে প্রায় ৭-৮ ঘন্টা রোদ পড়ে এমন যায়গায় গাছটি রাখতে হবে। রোদ কম হলে ফুল আসবে না। তবে অধিক রোদের কারনে পাতা বিবর্ণ (হলদে) হয়ে গালে কিছু দিনের জান্য ছায়ায় রেখে দিতে হবে। পাতা ঠিক হয়ে আসলে পূণরায় রোদে রাখতে হবে। অনেক সময় পানি বেশি দিলেও পাতা হলদে হয়ে যায়। তাই মাটিতে পানির অবস্থা বুঝে সড়া-নড়া করতে হবে।
রোগবালাই,
পোকামাকড় ও প্রতিকারঃ
রাজনীগন্ধার পোকা-মাকড় এর কথা আসলে প্রথমেই যে নাম আসে তা হল মিলিবাগ। রাজনীগন্ধা গাছে খুবিই মিলিবাগ আক্রমন করে। এছাড়া ল্যাদাপোকা, গোড়া পচা, শিষ ঢলিয়া পড়া, পাতায় হলুদ দাগ পড়া এবং পাতা শুকিযে যাওয়া ইত্যাদি রোগের প্রকোপও দখা যায়। রাজনীগন্ধা বিভিন্ন রোগ ও তার প্রতিকার -
১। রোগের নামঃ ল্যাদাপোকা, এফিড, থ্রিপস ও মিলিবাগ
রোগের লক্ষণঃ কচিপাতা ও কুড়ি খেয়ে গাছের ক্ষতি করে থাকে।
প্রতিকারঃ এ পোকা দমনে ১ লিটার পানিতে ৩০ ফোঁটা
ম্যালাথিয়ন গুলিয়ে নিয়ে ১০ দিন পরপর ৩ বার স্প্রে করতে হবে । স্প্রের ৩ দিন
পরপর ম্যানসার ১ লিটার পানিতে হাফ চা
চামুচ ভালো ভাবে গুলিয়ে নিয়ে তা দিয়ে পুরো গাছটিকে স্প্রে করে গোসল করিয়ে দিতে
হবে। অন্য সময় এটি মাসে অন্তত ১ বার করতে হবে। এতে গাছ সুস্থ, সবল ও রোগ মুক্ত থাকবে।
২। রোগের নামঃ ধ্বসা রোগ
রোগের লক্ষণঃ এ রোগের ফলে গাছের শিকরে পচন ধরে। গাছের পাতা খসে যায়। ফুলের মঞ্জরীগুলো ঢলে পড়ে।
প্রতিকারঃ এক্ষেত্রে আক্রান্ত গাছগুলো
তুলে ধ্বংস করতে হবে। ১ লিটার পানিতে ১ চা চামুচ (৪ গ্রাম) কুপ্রাভিট/বেনডাজিম/
ব্যাভিস্টিন/ সেভিন মিশিয়ে সেই মিশ্রণ গাছের গোড়ায় মাটিতে (টবে) ঢেলে দিয়ে ভিজিয়ে
দিতে হবে। এভাবে রোগাক্রান্ত গাছে ১৫ দিন পরপর ২ থেকে ৩ বার এই মিশ্রণ প্রয়োগ করতে
হবে।
এছাড়াও গাছে ছত্রাক আক্রান্ত হলে, ফুলের বোটা নরম হয়ে ঝড়ে যায়। এক্ষেত্রে প্রতিমাসে একবার নিয়মিত কীটনাশক [ম্যানসার ১ লিটার পানিতে হাফ চা চামুচ ভালো ভাবে গুলিয়ে
নিয়ে তা] দিয়ে পুরো গাছটিকে স্প্রে করে গোসল করিয়ে দিতে হবে।
৩। রোগের নামঃ বোট্রাইটিস - পাতায় দাগ ও ব্লাইট
রোগের লক্ষণঃ বর্ষা ঋতুতে এই রোগটি দেখা যায়। এ রোগের ফলে রজনীগন্ধার গাছের পাতার
অগ্রভাগ থেকে প্রথমে দাগ পড়ে। পরে তা শুকিয়ে বাদামী হয়ে যায় ও ধীরে ধীরে নীচের
দিকে পাতার কিনারা বরাবর ঢেউ খেলানো দাগের মত নামতে থাকে। ফুলের ক্ষেত্রে, প্রথমে আক্রান্ত ফুলে গাড় বাদামী রং এর দাগ পড়ে এবং পড়ে সমস্ত পুষ্পমঞ্জুরী শুকিয়ে যায়। গাছের কান্ডেও এই রোগের
প্রকোপ দেখা যায়। গাছ দুর্বল হয়ে শেষে মরে যায়।
প্রতিকারঃ একই
মাটিতে পরপর এক নাগাড়ে কয়েক বৎসর গাছ থাকায় এমনটি হয়। প্রাথমিকভাবে অল্প গাছ আক্রান্ত
হলে সেসব গাছের আক্রান্ত অংশ কেটে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। এই রোগ দমনে রোভরাল [ম্যানকোজেব- .২% হারে ] ৭-১০ দিন অন্তর স্প্রে করলে ভাল ফল পাওয়া যায়।
এ ছাড়া টবের মাটিতে রুটোন/এগ্রো-গ্রো (দানাদার) ১ চামুচ করে বৎসরে ১ বার প্রয়োগ করলে শিকড়ের রোগ বালাই কম হয়।
৪।রোগের নামঃ শিকড়ে গিঁট রোগ
রোগের লক্ষণঃ কৃমি গাছের শিকড়ে গুটি তৈরী করে। এ রোগে আক্রান্ত গাছের শিকড়ের মাঝে মাঝে ফুলের গিঁটেরমতো হয়ে যায়। ফলে গাছের মাটি থেকে খাদ্য ও পানি নেয়া ব্যাহত হয়। গাছ সহজে বাড়ে না,ফুল আসেনা। দূর্বল হয়ে শেষে গাছ মরে যায়।
প্রতিকারঃ একই মাটিতে পরপর এক নাগাড়ে কয়েক বছর গাছ থাকায় এম্নটা হয়ে থাকে। মাটিতে নিম খৈল ছিটানো যেতে পারে। টবের মাটিতে ১চা চামচ নিম খৈল ও ১চা চামচ নিউফরান একত্রে মিশিইয়ে তা দিয়ে দিতে হবে।
প্রাথমিক ভাবে অল্প গাছ আক্রান্ত হলে সেসব গাছ তুলে জমি থেকে দূরে ফেলতে হবে বা পুড়িয়ে ফেলতে হবে।আক্রান্ত স্থানের মাটি কিছুটা গর্ত করে খড় জ্বালিয়ে সে মাটি পুড়াতে হবে।
ফুল সংগ্রহঃ
আগষ্ট থেকে সেপ্টেম্বর এবং ডিসেম্বর-জানুয়ারী বৎসরে এ ২ বার রজনীগন্ধা ফুল দেয়। পুষ্পদন্ডের প্রথম ফুল ফুটলেই ডাঁটিসহ ফুল কাটতে হবে। কাঁটা ফুল আমরা ঘরে এনে পানিতে সংরক্ষন করতে পারি। সাধারণত ফুল কাটার পর ৪-৫ দিন সতেজ থাকে। ফুল না কেঁটে গাছেও সংরক্ষণ করা যেতে পারে। সকাল বেলা ঠান্ডা আবহাওয়ায় অথবা পড়ন্ত বিকেলে ফুল আধাফোটা অবস্থায় ডাঁটা সহ কাটতে হবে। একটি ভাল শিষে কমপক্ষে ৩০ জোড়া ফুল থাকতে পারে। ধারালো ছুরি দিয়ে মাটি থেকে ৪ ইঞ্চি উপরে কাঁটতে হয়। কাঁটার পর ডাটা হতে অপ্রয়োজনীয়
পাতা কেঁটে ফেলতে হয়। এতে পাতার প্রস্বেদনের মাধ্যমে জ্বলীয়বাষ্প বের হয়ে যেতে পারে না এবং ফুলও শুকিয়ে যাবে না। এরপর এটিকে বালতিতে চিনি
সহ পানিতে ২ ঘন্টা ভিজিয়ে রেখতে হয়। এ প্রক্রিয়ায়
ফূলের জীবনকাল (Vase life) দীর্ঘায়িত হয়।
কন্দ উত্তোলন, সংরক্ষণ ও বংশবিস্তারঃ
রজনীগন্ধা বীজ ও
কন্দ উভয় মাধ্যমেই বংশবিস্তার করে থাকে। তবে আমাদের দেশে সাধারণত
কন্দ দ্বারাই রজনীগন্ধার চাষ করা হয়ে থাকে। ডিসেম্বর-জানুয়ারী মাসে ফুল ফোটা শেষে মাটি থেকে কন্দগুলি
তুলে এনে পরিস্কার করে বাছাই করে বেশ কয়েক দিন ছায়াযুক্ত শুষ্ক মেঝেতে ছড়িয়ে রেখে শুকিয়ে নিতে হয়। কন্দ কে
ব্যাক্টেরিয়ার হাত থাকে বাঁচাতে-
১ লিটার পানিতে ৪ গ্রাম ব্লু কপার ও ৩০ ফোঁটা ম্যালাথিয়ন মিশিয়ে ২৪ ঘন্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে।
এরপর পানি ঝরিয়ে ২-৩ দিন ছায়ায় শুকিয়ে জমিতে লাগিয়ে এ কন্দ গুলো পরবর্তীতে
বংশবিস্তারের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। রজনীগন্ধার কন্দ বেশ কষ্টসহিষ্ণু এবং
সাধারণ অবস্থায় এর কন্দ সহজেই সংরক্ষণ করা যায়।
রাজনীগন্ধা গাছের রোপন [Part-1]





0 comments:
Post a Comment